বিমানে নারী কেবিন ক্রু যৌন হয়রানির শিকার

বাংলাদেশ বিমান

বিমানে নারী কেবিন ক্রুরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিচ্ছে না। এমনকি এসংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ করার পরও উল্টো ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ‘ভিআইপি তদবিরে’ অভিযুক্তকে প্রমোশন দিতেও বাধ্য করা হচ্ছে।

নারী বিমান ক্রুদের অভিযোগ, বিভিন্ন দেশে ফ্লাইটে যাওয়ার পর সহকর্মীরাই তাঁদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে নির্যাতন করেন। এমনকি তাঁদের ধর্ষণের চেষ্টা পর্যন্ত করা হয়। মাঝেমধ্যে পুরুষ সহকর্মীদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন তাঁরা। তবে বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগ আসার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

Loading...

এ প্রসঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এম মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘বিমান ক্রুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এ ধরনের কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তবে এক নারী ক্রু অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে নানা অনিয়ম চলে আসছে। তবে বর্তমান সরকার বিমানকে লাভজনক করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিমানের চেয়ারম্যান ও এমডিও চেষ্টা চালাচ্ছেন সরকারের উদ্দেশ্যগুলো সফল করতে। কিন্তু তাতেও বাধা আসছে। বিমানে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয়। নিজেদের স্বার্থে তারা বিমানকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ধরা পড়লেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। নতুন করে যোগ হয়েছে বিমানের নারী ক্রুরা পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি এক নারী কেবিন ক্রু চাকরি ফেরত চেয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে আবেদন করার পাশাপাশি এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন। বিমানের পরিচালকের (প্রশাসন) কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, হোটেলে নিয়ে সহকর্মীকে জড়িয়ে ধরে অশ্লীল আচরণ করা হয়েছে। একপর্যায়ে অনৈতিক প্রস্তাব। রাজি না হওয়ায় জোর করে যৌন হয়রানি পর্যন্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণ হয়েছিল ওই সব অভিযোগ। সাজাও পেয়েছিলেন। সাজায় স্পষ্টভাবে তাঁকে ‘পদাবনতি’ দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু যৌন হয়রানির সার্টিফিকেটধারী ওই কর্মকর্তা পেয়ে গেলেন পদোন্নতি। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বর্তমান উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. নুরুজ্জামান (রনজুু)।

ওই নারী বিমান ক্রু লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘আমি এফ/এসএস… আট মাস ধরে বিমান এয়ারলাইনসে কর্মরত আছি।  ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট বিজি-০১৫ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে লন্ডনে যাওয়ার পর সহকর্মী চিফ পার্সার নুরুজ্জামান রনজু এবং এফ/এস সিনহা কর্তৃক অপ্রীতিকর অশালীন মর্মান্তিক আচরণের শিকার হয়েছি—যা কোনো নারী সহকর্মী হিসেবে কাম্য নয়। আমি চাইনি এ ঘটনা জানাজানি হোক। আমার পদমর্যাদা বা সম্মান নিয়ে কোনো কথা হোক। কিন্তু ঘটনাটি প্রকাশ হয়ে যায়। আমার সিনিয়র সহকর্মীরা আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করে বেড়াচ্ছে। এবং বিভিন্ন অশ্লীল কথাবার্তা বলে যা আমার খারাপ লাগে। পরে বাধ্য হয়ে আমি লিখিতভাবে বিষয়টি জানাচ্ছি। তা ছাড়া লন্ডন থেকেই পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন মো. তোফায়েল আহম্মদকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

জানা যায়, ঢাকায় ফিরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ওই কেবিন ক্রু। নির্যাতনকারী দুজনের সঙ্গে কখনো তাঁকে ফ্লাইটে না দেওয়ারও অনুরোধ করা হয়। দীর্ঘ সাত মাস তদন্তের পর রনজুকে দোষী সাব্যস্ত করেন বিমানের তদন্ত কর্মকর্তা। রনজুর বিরুদ্ধে দেওয়া প্রতিবেদনে তাঁর ‘অশোভন, অনৈতিক আচরণ এবং আপত্তি করা সত্ত্বেও জোর করার’ বিষয়টি প্রমাণিত হয়। ২০১৫ সালের ২ জুন শাস্তিস্বরূপ তাঁকে ‘চিফ পার্সার’ থেকে ‘ফ্লাইট পার্সার’ পদে পদাবনতির (ডিমোশন) নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রশাসন পরিদপ্তর ও তদন্ত শাখার ওই প্রতিবেদন উপেক্ষা করে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রনজুকে বিমানের ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সাক্ষাৎকারে তাঁকে কৃতকার্য করে ২০১৭ সালের মার্চে ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিমানের এইচআর পলিসি অনুযায়ী একই পদে তিন বছর থাকার পর কোনো ব্যক্তিকে ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে রনজুকে মাত্র ৯ মাসের মাথায় ম্যানেজার ডিজিএম পদে পদোন্নতি দেয় বিমান কর্তৃপক্ষ।

বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, কেবিন ক্রু ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এখন চাকরি ফিরে পেতে বিমান কর্মকর্তাদের দুয়ারে দুয়ারে বেড়াচ্ছেন তিনি। এ ঘটনায় রনজুকে শাস্তি দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। সিনহার অপরাধও একই রকম ছিল। কিন্তু তাঁকেও সাজা দেওয়া হয়নি। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, বছরখানেক আগে আরেক কেবিন ক্রু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তা সত্য। তবে অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Loading...